সর্বশেষ আপডেট
কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়িতে ৫ কেজি গাঁজাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার অরুয়াইল ইউপি নির্বাচনে আবদুল হাকিম দলীয় মনোনয়ন সহ বিজয় প্রত্যাশী সরাইল উপ-নির্বাচনে জাল ভোট দেওয়ার চেস্টায় ৩ তরুণীর কারাদণ্ড সরাইল চুন্টা ইউপি’র উপ-নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী বিজয়ী কুড়িগ্রামে পাওয়ার ট্রিলারের ফলায় জড়িয়ে শিশুর মৃত্যু কুড়িগ্রামে বিএনপির মানববন্ধন অনুষ্ঠিত কুড়িগ্রামে নারী নির্যাতন ও ধর্ষন বিরোধী বিট পুলিশিং সমাবেশ অনুষ্ঠিত কুড়িগ্রামে শিশু- নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ বিরোধী গণসচেতনতা সৃষ্টি ও মতবিনিময় সভা। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে সহায়ক উপকরণ পেলেন কুড়িগ্রামের ২৫ জন দুঃস্থ প্রতিবন্ধী কুড়িগ্রামে নারীর মরদেহ উদ্ধার
বাবার স্নেহের পরশ মাখা হাত।। সাইফ তমাল।।জাগ্রত নিউজ

বাবার স্নেহের পরশ মাখা হাত।। সাইফ তমাল।।জাগ্রত নিউজ

বাবার স্নেহের পরশ মাখা হাত
সাইফ তমাল

বহুদিন যাবৎ স্নেহের পরশ মাখা হাত খুঁজতে খুঁজতে অনেকটা বছর পিছনে ফেলে এসেছি। তবু্ও যেন স্নেহের হাত খোঁজার কোনো ক্লান্তি নেই। অামি জানি, যে হাত গত হয়ে গেছে, যে হাত মাটিতে মিশে গেছে, সে হাত আর কোনদিন বাস্তবে ফিরে আসবে না। হারিয়ে যাওয়া সেই শক্তিশালী কর্মঠ হাত দু’টি বড় বেশি মনে পড়ে।

হাত দু’টি ছিল স্নেহের। হাত দু’টি ছিল শাসনের। প্রখর রোদে, তুমুল বৃষ্টিতেও সেই হাত দু’টির কখনো ক্লান্তি ও ভয় ছিল না। হাত দু’টি ছিল পরিশ্রমী। সেই হাত ধরে ছোট ছোট পায়ে হাঁটতে শিখেছিলাম। ভালো পথ, মন্দ পথ বুঝতে শিখেছিলাম। গাঁয়ের মাটির পথ আর শহুরে পিচঢালা পথের পার্থক্য বুঝতে শিখেছিলাম। সেই হাতটি ছিল আমার বাবার হাত।

বাবা যখন পুকুরে গোছল করতে যেতো তখন বায়না ধরে বাবার সাথে প্রতিদিন পুকুরে গোছল করতে যেতাম। মা বাবাকে বলত সাঁতার শেখেনি, কানে জল যাবে ওকে পুকুরে নেওয়ার দরকার নেই, বাসায় গোছল করুক। বাবা বলত সাঁতার না শেখালে শিখবে কিভাবে! কিন্তু, আমার বায়না কোনকিছুতেই থেমে থাকত না, যতক্ষণ পর্যন্ত বাবার সাথে পুকুরে গোছল করতে না যেতাম।

বাবা পুকুরে নেমে আমাকে আগে সাঁতার শেখাত। একহাত অামার বুকে অন্য হাত আমার পেটের নিচেই রেখে জলের উপর ধরে রাখত। আমি মনের সুখে দুইহাতে আর দুইপায়ে দাপাদাপি করে জল ছিটিয়ে দিতাম বাবার মুখমন্ডলে। কই বাবাতো সেদিন আমার উপর রাগ করেনি? রাগ যদিও করেছিল হয়তো আমি বুঝিনি! এখন মনে হয় বাবা রাগ করতে জানে না।

গোছল করে ফিরতে দেরি হলে মা বাবাকে বলত, এতো সময় গোছল করে ওর চোখ-মুখ লাল করে নিয়ে এসেছ! জ্বরজারি হলে আমি ডাক্তারের বাড়ি দৌঁড়াতে পারবো না। বাবা কি আর মার কথা শুনতো? কখনো না। বাবা মাকে মিথ্যা বলতো বলতো, আরে একটু সময় সাঁতার শিখিয়েছি ওতেই কিছু হবে না! কিন্তু, আমার মুখমণ্ডল দেখে মা ঠিকই বুঝতে পারতো। মা বুঝতে পারলেও বাবার তাতে কিছুই আসতো-যেতে না। পরেরদিন দুপুরবেলা একই অবস্থা।

আমাদের বাড়ির পাশে একটি বাজার ছিল। বাবা সেই বাজারে বাজার-সদাই কিনতে যেতো। মা যখন বাবার হাতে বাজার-সদাইয়ের ব্যাগ তুলে দিতো, তখন আমি ঠিকই বুঝতে পারতাম বাবা বাজারে যাবে। ঠিক তখনই শুরু হতো আমার বাজারে যাওয়ার বায়না। আমাকে সঙ্গে নিয়ে বাবা বাজারে যেতো। বাজারে গিয়ে আমার হাতে খাবার কিনে দিতো।

তখন বাজারে মিষ্টির দোকানে সন্দেশ পাওয়া যেতো। মিষ্টির দোকান থেকে সন্দেশ কিনে আমার হাতে দিয়ে শাক-সবজি ও মাছের দোকানের দিকে হাঁটা শুরু করতো। বাসায় আসার আগমুহূর্ত পর্যন্ত আমার আর সন্দেশ খাওয়া হয়ে উঠতো না। কারণ, আমার একহাতে সন্দেশের প্যাকেট ধরে রাখা থাকতো। আর অন্য হাত বাবার বিশ্বস্ত হাতের মুঠোয়। সেই অবস্থায় ছোট ছোট পায়ে বাবার সাথে বাজারের মধ্যে ঘুরে বেড়াতাম।

তখন সবেমাত্র বুঝতে শিখেছি। পড়াশোনায় যতোটা মনোনিবেশ ছিল, তার অধিক মনোনিবেশ ছিল খেলাধুলার প্রতি। একদিন পৌষমাসে দুপুরের খাবার খেয়ে বাবা বারান্দায় চেয়ারে বসেছিল। আমি এবং আমার এক সহপাঠী উঠানে ক্রিকেট খেলায় মগ্ন ছিলাম। কিছুক্ষণ সে বল ছুঁড়ে মারে আমি ব্যাট দিয়ে বল পিটায়। তারপর আমি বল ছুঁড়ে মারি সে পিটায়। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর একপর্যায়ে বাবার মুখের বামপাশে বলের আঘাত লাগে। সাথেসাথে বাবা অজ্ঞান হয়ে চেয়ারের উপর থেকে নিচেই পড়ে যায়। বাড়ির সবাই দৌঁড়ে গিয়ে বাবাকে সুস্থ করার চেষ্টা করে। আমি তখন ভয়ে দৌঁড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। কই! সেদিন তো সুস্থ হয়ে বাবা আমাকে কিছু বলেনি! না-কি বাবা রাগ করতে জানতো না! কি জানি বাপু!

গরমের এক সকালে বাবা নুতন ঘরের বারান্দার মাটি কাটতেছিল। মাটি কাটা বন্ধ করে কোদাল রেখে বাবা কোথায় যেন গিয়েছিল। আমি কৌতুহলে কোদাল হাতে নিয়ে খামখেয়ালিতে বোনের ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে কোপ দিয়েছিলাম।(বাহ! আমার কি দোষ! আমি বারবার সরে যেতে বলার পরেও বোন খুঁটি ধরে পা নাড়াচাড়া করছিলো)। ছোট কচি পা কোদালের সামান্য কোপ লাগতেই আঙ্গুলের অর্ধেক কেটে গিয়েছিল। রক্ত দেখে দৌঁড়ে বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছিলাম।

আমি ভেবেছিলাম বাবা হয়তো আমাকে খুঁজে পাবে না। কিন্তু, আমি বাবার কাছে ধরা পড়ে গিয়েছিলাম সহপাঠীদের ঘরের বারান্দায় মার্বেল খেলা অবস্থায়। বাবার হাতে ধরা পড়ে ভয়ে সে কি তুমুল কাঁন্নাকাটি করেছিলাম। কই, সেদিন তো বাবা কিছু বলেনি! বাবা হয়তো কিছু বলতেই জানে না। বাবা শুধু ক্ষমা করতে জানে। নিজের গায়ে দোষ নিতে জানে। কর্মঠ হতে জানে। স্বার্থপর হতে জানে। স্বার্থপরের মতো অন্যকোন জগতে হারিয়ে যেতে জানে। নিজস্বার্থে ফাঁকি দিতে জানে।

আজও নিজের চোখে দেখা হয়নি পৃথিবীর অনেককিছু। ঋতু পরিবর্তনের লীলাখেলা চলে সব সময়। ঋতু আসে ঋতু যায়। আকাশ মেঘলা হয়। মেঘলা আকাশ ফুঁড়ে উকি দেয় নীল। বাবা আর ফিরে আসে না।

আজ পৃথিবীর বদলে গেছে অনেককিছু। যে পুকুরে সাঁতার শিখেছিলাম সে পুকুর হয়তো হারিয়েছে তার জৌলুশ। শরিকের ভাগবাটোয়ারায় হয়ে গেছে ক্ষীণ। আমাদের এলাকার সেই মেঠোপথে এখন কংক্রিটের খেলা। হাটঁবাজার হয়ে গেছে আধুনিক। ঘোষেরা এখন কি আর সন্দেশ তৈরি করে? না-কি সন্দেশে এখন আর সেই স্বাদ নেই? পরবাসী নাক কি আর বুঝতে পারে সন্দেশের সেই ঘ্রাণ, সেই স্বাদ? কিভাবে বুঝতে পারবে বাবা তুমি বল তো?

পৃথিবীর সবকিছু যখন ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে যায় গভির রাতে, তখন আমি বালিশে মাথা রেখে খুঁজতে থাকি তোমার অস্তিত্ব। তোমার চলাচল। একদিন তোমার কাছে শিখেছিলাম সকল আধুনিকতার মূলমন্ত্র। যখন বায়না করতাম, আমার ছোট শার্টের পকেটে টাকা গুঁজে দিতে কি অনায়াসে। আমার আবার চকচকে নতুন টাকার প্রতি ছিল খুবই আগ্রহ। টাকার মান কতো সেটা কোনো বিষয় নয়। চকচকে টাকা আমার চাই। এখন বুঝি পুরোনো হলেও তার মূল্য অনেক। সচ্ছ কাঁচ সম্পূর্ণ ক্ষত-বিক্ষত করে দিতে পারে ভিতরে বাহিরে। নিঃশ্বেষ করে দিতে পারে জীবন্ত প্রাণ।

তুমি বিশ্বাস করো বাবা, বহু বছর গত হলো আমার শার্টে কোনো পকেট নেই। সচ্ছ টাকার প্রতিও আমার কোনো লোভ নেই। পুরোনোতেই নির্ভরশীল বেশি। তুমি কেন বুঝতে চাও না বাবা। ঘুড়ি যতই উপরে উঠে খেলা করে সুখের, লাটাইতে পড়ে থাকে অস্তিত্ব। আমি এক লাটাই ছাড়া ঘুড়ি। বোনের কাটা আঙ্গুল দেখে উপলব্ধি করি তোমার শাসনের চোখ। যে চোখের অপর পৃষ্ঠে লুকিয়েছিল স্নেহ, আদর, ভালোবাসা। খুঁজে পেয়েছিলাম আদর্শ মানুষ হওয়ার পাঠশালা। যে হাতের উপর অটুট বিশ্বাস রেখে অথই জলে সাঁতার শিখতে বিন্দুমাত্র শঙ্কা ছিল না। নিভৃতে তোমার সেই হাত দু’টি আজও খুঁজি।

আমাদের সংবাদ শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2020 jagrotoonews.com
Developed BY MRH
[X]